আইসোটোপ কাকে বলে? তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের কাজ ! 

আইসোটোপ কাকে বলে

আইসোটোপ কাকে বলে: রসায়ন বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচিত বিষয় হলো আইসোটোপ । আইসোটোপ কি সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা সকলের থাকলেও আইসোটোপ কাকে বলে তা অনেকেরই অজানা । সে কারণেই মূলত আমরা আজকের আর্টিকেল অজান্তে চলেছি আইসোটোপ সম্পর্কে এছাড়াও আইসোটোপ সম্পর্কিত তথ্য থাকবে এই আর্টিকেলের সর্বত্র ।

আইসোটোপ কাকে বলে ?

যখন একাধিক পরমাণুর পরমাণু সংখ্যা এক হয় তবে ভর সংখ্যা ভিন্ন হয়ে থাকে তখন সেই পরমাণুসমূহ কে একে অপরের  আইসোটোপ বলা হয় । 

আইসোটোপ সমূহে পরমাণু সংখ্যা এক হলেও ভর সংখ্যা আলাদা হয় । কেননা নিউট্রন সংখ্যা হয় ভিন্ন। আপনি যদি ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন সম্পর্কে না জেনে থাকেন তাহলে নিচে আলোচনা করা হলোঃ 

ইলেকট্রনঃ ইলেকট্রন মূলত স্ট্রিম দ্বারা তৈরি এক ধরনের কনা যেটিকে অত্যন্ত ওজনহীন বলে বিবেচনা করা হয় । ইলেকট্রন মূলত পরমাণুর কক্ষপথ এ ঘূর্ণায়মান থাকে যেটি ভেতরের নিউক্লিয়াস কে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে । প্রোটন এবং নিউট্রন দ্বারা নিউক্লিয়াস গঠিত হয় । সবচেয়ে বড় কথা হলো ইলেকট্রন ঋনাত্বক চার্জ বিশিষ্ট হয়ে থাকে । 

প্রোটনঃ পরমাণুর ধনাত্মক আধানযুক্ত কণা কে বলা হয় তাকে প্রোটন । প্রোটন অবস্থান করে নিউক্লিয়াসে এবং এটি ইলেকট্রন নিউট্রন অপেক্ষা যথেষ্ট ভারী একটি কনা। 

নিউট্রনঃ নিউট্রন মূলত আধান বিহীন একটি কণা । এবং এটিও নিউক্লিয়াসে অবস্থান করে । তবে তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ার কারণে যেসকল নিউক্লিয়াসে নিউট্রন সংখ্যা বেশি থাকে  সেই সকল নিউক্লিয়াস থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বের হয় ।  যেমনটা কি আলফা রশ্মি এবং বিটা রশ্মি  ।  

আইসোটোপ এর একটি উদাহরণ দেয়ার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা যাকঃ

হাইড্রোজেন এর মোট তিনটি আইসোটোপ রয়েছে সেগুলো সরাসরি প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা যায় । এই সকল আইসোটোপ কে তথা ক্রমে প্রোটিয়াম, ডিউটেরিয়াম এবং টিট্রিয়াম নামে ডাকা হয়। 

  • প্রোটিয়ামে কেবল মাত্র একটি প্রোটন থাকে তবে কোনো ধরনের নিউট্রন থাকে না ।
  • ডিউটেরিয়ামের মাত্র একটি প্রোটন থাকে এবং একটি নিউট্রন থাকে ।
  • টিট্রিয়ামে কেবলমাত্র একটি প্রোটন থাকে তবে দুইটি নিউট্রন থাকে । 

অর্থাৎ প্রতিটি ধাপে একটি করে নিউট্রন সংখ্যা বৃদ্ধি পায় যার অর্থ ভর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে । এবং এই তিনটিকে একে অপরের আইসোটোপ বলা হয়। 

হাইড্রোজেনের আইসোটোপ কয়টি ?

হাইড্রোজেন এর মোট সাতটি আইসোটোপ রয়েছে । তার মধ্যে প্রথম তিনটি আইসোটোপ সরাসরি প্রকৃতি থেকে সংগ্রহ করা যায় । এবং বাকি চারটি আইসোটোপ ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হয় । 

এই তিনটি আইসোটোপের মধ্যে রয়েছেঃ প্রোটিয়াম, ডিউটেরিয়াম এবং টিট্রিয়াম।  

তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ কাকে বলে ? 

আমরা ইতিমধ্যে জেনেছি আইসোটোপ কাকে বলে। এখন আমরা জানতে চলেছি এজন্য আইসোটোপ কাকে বলে ?

যেসকল আইসোটোপ থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি নিঃসৃত হয় সেগুলোকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ বলা হয় । মূলত আইসোটোপের ভর বেশি হওয়ার কারণে যখন বাইরে থেকে শক্তি প্রয়োগ করে এই সকল আইসোটোপের বন্ধন ভঙ্গ করার এটা করা হয় তখন এর ভেতর থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি নির্গত হয় । 

তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের নানাবিধ কাজ হয়েছে । তবে বর্তমানের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ অপবিজ্ঞান এর কাজেও ব্যবহার করা হয়ে থাকে । তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ এর কাজ সম্পর্কে আলোচনা করা যাকঃ 

চিকিৎসা ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার-

চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে । 

  • কোবাল্টের আইসোটোপ ব্যবহার করে টিউমার নিরাময় করা হয় এছাড়াও টিউমার শনাক্তকারী হয়ে আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। 
  • টেকনিশিয়ান 99 নামের এক ধরনের আইসোটোপ হয়েছে যেটি ব্যবহার করে শরীরের ভেতর ছবি তোলা হয়ে থাকে । মূলত শরীরের একটি নির্দিষ্ট অংশের ছবি ধারণ করার জন্য সর্বপ্রথম সেই স্থানে টেকনিসিয়াম 99 আইসোটোপের ইনজেকশন পুশ করা হয়। অতঃপর সেখান থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি বের হতে থাকে । মূলত সেই সকল তেজস্ক্রিয় রশ্মি শনাক্ত করে নির্দিষ্ট অংশের ভেতর কার ছবি তোলা হয় । সাধারণত টেকনিশিয়ান 99 আইসোটোপের  লাইফটাইম হয়ে থাকে 6 ঘন্টা বা তার বেশি । 
  • এছাড়াও থাইরয়েড রোগ সনাক্ত এবং থাইরয়েড রোগ নিরাময় করার জন্য আয়োডিনের এক ধরনের আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে । 
  • ইরিডিয়াম নামক এক ধরনের পরমাণুর আইসোটোপ ব্যবহার করে ক্যান্সার নিরাময় করা হয়ে থাকে এছাড়াও কেমোথেরাপির কাজে ব্যবহার করা হয় । 
  • অক্সিজেনের আইসোটোপ ব্যবহার করে শ্বাসকষ্ট রোগের আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা প্রদান করা যেতে পারে । যদিও সেটি অনেক ব্যয়বহুল । 
  • মানবদেহের ক্ষতিগ্রস্ত কোষ নিরাময় করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদার্থের আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে । তবে ক্যান্সার জটিলতায় আক্রান্ত কোষগুলো নিরাময়ের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার সবচেয়ে বেশি । 

তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ব্যবহার –

শুধু চিকিৎসা ক্ষেত্রে নয় বরং কৃষি ক্ষেত্রে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে । 

  • জমিতে কি পরিমাণ সার অথবা কীটনাশক প্রয়োগ করা প্রয়োজন তা মূলত পরিমাপ করার জন্য গাইগার মুলার কাউন্টার নামের একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হয় যেটি পরিচালিত হয়ে থাকে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ এর মাধ্যমে । এতে করে একজন কৃষক পরিমিত মাত্রায় কীটনাশক অথবা রাসায়নিক সার ব্যবহার করে থাকেন যার ফলে পরিবেশ অথবা আমাদের জমির ওপর খুব একটা গুরুতর প্রভাব পড়ে না । 
  • তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করা হয়ে থাকে । যেটি একটি দেশের সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে থাকে । তবে অনেক ক্ষেত্রে এটি নির্দিষ্ট জাতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে । 
  • তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে পারমাণবিক চুল্লি তৈরি করা হয়ে থাকে । যেখান থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব । বর্তমানে বাংলাদেশের পাবনার রূপপুরে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত অন্যতম মেগা প্রজেক্ট পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে ।  
  • মাটির নিচ থেকে প্রাপ্ত কোন ফসিলের বয়স নির্ণয় করার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে কার্বনের আইসোটোপ । 
  • এছাড়াও কার্বন-12 আইসোটোপের ১২ ভাগের এক ভাগ এর ভরকে আদর্শ বিবেচনা করে অন্য সকল পরমাণুর আপেক্ষিক আণবিক ভর নির্ণয় করা হয়ে থাকে । সবচেয়ে মজার বিষয় হলো হাইড্রোজেনের একটি পরমাণুর ব্যবহার করেও এটি করা সম্ভব । তবে হাইড্রোজেনের ভর নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কার্বন 12 আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে । সে কারণে বলা যেতে পারে গাড়ির ওপর নাও, নাওয়ের ওপর গাড়ি। 
  • পৃথিবীর বয়স নির্ণয় করার জন্য কার্বন-১৪ আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়েছিল । 

অক্সিজেনের তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ- 

অক্সিজেনের আইসোটোপ সংখ্যা 2 টি । O16 এবং O17

  • অক্সিজেনের আইসোটোপ খুবই সীমিত পরিসরে ব্যবহার করা হয়ে থাকে । আমরা আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজে যে অভিযোগটি ব্যবহার করি সেটি হল O16 
  • অক্সিজেনের আইসোটোপ চিকিৎসা ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে । বিশ্বাস করে শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত রোগীদের জন্য অক্সিজেনের আইসোটোপ বিশেষভাবে কার্যকর । 

তবে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ অনেক ক্ষেত্রে এতে জাতির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অমানবিক এবং বিশ্বজনের নিন্দিত পারমানবিক বোমা হামলা ঘৃণিত বিষয় বলে বিবেচনা করা হয় । বর্তমানে যে কয়েকটি পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো রাশিয়া । অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে 1983 সালে রাশিয়াতে পারমাণবিক চুল্লি বিস্ফোরিত হয়ে বহু মানুষ মারা যায় এবং সেই এলাকা পুরোপুরি বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ে । 

আমাদের আজকের আর্টিকেল এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল আইসোটোপ কাকে বলে সে সম্পর্কে ! যদি আর্টিকেলটির মাধ্যমে আপনি বিন্দুমাত্র উপকৃত হয়ে থাকেন তবে, প্রগতিশীল অতি নগন্য, বাংলাদেশের কোন এক স্টাডি রুম থেকে পরিচালিত ব্লগ হিসেবে আমরা সার্থক ! 

আরো পড়ুনঃ

 

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *