চেক লেখার নিয়ম – যা আপনি না জানলে বিপদে পড়তে পারেন!

যেকোনো ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের সাথে লেনদেন করার অন্যতম এবং অতি পুরানো পন্থা হলো চেক লেখা। কাজেই ব্যাংক চেক লেখার নিয়ম জানাটা অতীব জরুরী।

বর্তমানে আর্থিক লেনদেন করার বিভিন্ন আধুনিক পদ্ধতি থাকলেও মান্ধাতার আমলের ব্যাংক চেক দিয়ে লেনদেন করার প্রচলন রয়েছে এখনো।

বিশেষ করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাংক থেকে টাকা উইথড্রো করতে গেলে চেক লেখার প্রয়োজন পড়ে।

এবং আপনি যদি ব্যাংক চেক লেখার নিয়ম এখনো না জেনে থাকেন তাহলে এই আর্টিকেলটি আপনার জন্য ।

ব্যাংক চেক কত প্রকার

চেক প্রধানত তিন প্রকারের হয়ে থাকে।

১. বাহক চেক

যখন চেকের সাথে “বাহককে” লেখা থাকে তখন সেই সেটকে বলা হয় বাহক চেক। ব্যাংক থেকে আমাদেরকে যে ধরনের চেক দেওয়া হয় তার অধিকাংশই হয়ে থাকে বাহক চেক।

এই চেক নিয়ে যে কোন ব্যক্তি ব্যাংকে উপস্থাপন করতে পারলে তাকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা দিতে বাধ্য থাকে। তবে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে এই চেক ব্যবহৃত হয় না ।

২. হুকুম চেক 

হুকুম শেখের সাহায্যে কেবলমাত্র একাউন্টের প্রকৃত মালিক টাকা উত্তোলন করতে পারেন। সচরাচর এই ধরনের চেকগুলোতে “বাহককে” লেখাটি কেটে দেওয়া হয়।

সচরাচর বড় ধরনের আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে এ ধরনের চেক ব্যবহৃত হয়।

৩.দাগ কাটা চেক

দাগ কাটা চেকগুলো, একাধরে বাহক চেক আবার হুকুম চেক। যদি চেকের উপরে সমান্তরালের দাগ কাটা থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে এটি একটি বাহক চেক ।

আর যদি ক্রস ভাবে দাগ কাটা থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে এটি একটি হুকুম চেক।

দাগ কাটা চেক লেখার নিয়ম অন্য চেক লেখার নিয়ম থেকে অনেকটাই আলাদা ।

সাধারণত এটিকে দাগ কাটা চেক বা ক্রস চেক বলা হয়ে থাকে। ক্রস চেক এর ব্যবহার আমাদের বাংলাদেশে খুব একটা দেখা না গেলেও মেক্সিকো ভারত ইতালি জাপান আমেরিকা চীন ফ্রান্স রাশিয়া ইত্যাদিতে দেশে অহ:রহ দেখা যায়। 

চেক লেখার নিয়ম

একটি চেকে প্রথমত এই অংশগুলি থেকে থাকে:

  • ব্যাংক এবং ব্রাঞ্চের নাম: 

এই অংশ মূলত আপনাকে ব্যাংক এবং ব্যাংকের শাখার নাম উল্লেখ করতে হবে । অনেক ক্ষেত্রে ই এফ টি লেনদেন করার জন্য রাউটিং নাম্বারেরও প্রয়োজন পড়ে ।

  • চেক নাম্বার: 

চেক বইয়ের প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় একটি করে ইউনিক নাম্বার দেখতে পাওয়া যায়। এটি মূলত নয় ডিজিট এর বেশি হয়ে থাকে । মাধ্যমে ব্যাংকের কর্মচারীদের আপনার লেনদেন ট্র্যাক করতে সুবিধা হয়। 

  • তারিখ:

 ডান দিকে তারিখ লেখার জন্য কতগুলো বক্স দেখতে পাওয়া যায়। এখানে , প্রথমত দিন, অতঃপর মাস এবং তারপর সাল লিখতে হয় ।

অবশ্যই আপনি যে দিনের টাকা উত্তোলন করতে চান সেই দিনটিই উল্লেখ করতে হবে ।

  • প্রাপক বা পেই টু 

এই অংশে আপনি যে ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানকে টাকা দিতে চান তার নাম উল্লেখ করতে পারবেন । অথবা নিজে যদি টাকা উত্তোলন করতে চান তাহলে সে ক্ষেত্রে “সেলফ” বা “নিজ” লিখবেন।

ঠিক তার নিচে থাকে একটি বড় ড্যাশ বা লাইন । যেখানে আপনাকে টাকার পরিমাণটি কথায় লিখতে হবে । সচরাচর এর শেষে “মাত্র” শব্দটি উল্লেখ থাকে।

  • অংকে টাকার পরিমান:

 এই অংশটিতে আপনাকে অংকের টাকার পরিমাণ উল্লেখ করতে হবে। অবশ্যই টাকার অংকটি স্পষ্টভাবে লিখতে হবে । যদি কোন কারনে অস্পষ্টতা থাকে অথবা ঘোষামাজা হয়ে থাকে তাহলে সেই ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অথবা ব্যাংকের ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

  • সিগনেচার লাইন: 

এই অংশটিতে অ্যাকাউন্ট হোল্ডারের সিগনেচারের প্রয়োজন পড়বে । ব্যাংকের দায়িত্বরত কর্মচারীরা এই সিগনেচারটি মিলিয়ে দেখে থাকেন ।

সুতরাং যে সিগনেচারটি আপনি ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় দিয়েছিলেন সেই সিগনেচারটি টাকা উইথড্র করার সময় করতে হবে।

ইংরেজিতে চেক লেখার নিয়ম

১. পে টু (pay to)

এই অংশটিতে আপনি যে ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের কাছে টাকা হস্তান্তর করতে চান তার নামটি ইংরেজিতে লিখুন।

অথবা আপনি যদি নিচে টাকা উত্তোলন করতে চান তাহলে সে ক্ষেত্রে লিখুন “self”

২.the sum of taka

এই অংশটিতে ইংরেজিতে টাকার পরিমাণ লিখতে হবে কথায়। এবং সবশেষে only শব্দটি উল্লেখ করবেন। 

ঠিক তার পাশেই অংকে টাকার পরিমাণ লেখার একটি বক্স দেওয়া আছে। সেখানে টাকার পরিমাণ অংকে উল্লেখ করুন।

৩.date

আপনি যে তারিখে টাকা উত্তোলন করতে চান সেই তারিখটি লিখুন।

যদি আপনি ২০২২ সালের অক্টোবর মাসের ১৪ তারিখে টাকা উত্তোলন করতে চান তাহলে ঘরগুলো এভাবে পূরণ করুন:

14102022

সবশেষে নিচের দিকে আপনাকে সিগনেচারটি দিতে হবে । যদি ব্যাংক একাউন্ট খোলার সময় সিগনেচারটি আপনি বাংলায় দিয়ে থাকেন তাহলে এক্ষেত্রেও বাংলায় আপনাকে সাক্ষটি করতে হবে।

চেক হারিয়ে গেলে করণীয়

চেক লেখার নিয়ম

অনেক সময় দুর্ঘটনাবসত আমরা চেক হারিয়ে ফেলি।

যদি আপনার সাথে কখনো এমন ঘটনা ঘটে থাকে তাহলে নিয়ম অনুযায়ী, অবশ্যই আপনাকে নিকটস্থ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করতে হবে।

সত্যায়িত কপি এবং সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের প্রমাণাদি সহ ব্যাংক একাউন্ট মালিকের নিজের সংশ্লিষ্ট থানায় উপস্থিত হয়ে একটি নতুন চেক বই ইস্যু করার জন্য আবেদন করতে হবে।

মনে রাখবেন,একটি চেক হারানোর জন্য অনেক ক্ষেত্রে আপনাকে নানাবিধ হয়রানি শিকার হতে হবে। কাজেই চেকটিকে সযত্নে সংরক্ষণ করুন।

চেক ডিজঅনার মামলা করার পদ্ধতি কি? 

চেক ডিজঅনার মামলা করার জন্য প্রথমে আপনাকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে গিয়ে ডিজঅনার আবেদন করে আসতে হবে। 

এরপর সম্পূর্ণ চেকের টাকা ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করার জন্য একটি উকিল নোটিশ বা লিগেল নোটিশ প্রদান করতে হবে।

এক্ষেত্রে আপনি চাইলে কোন একজন অভিজ্ঞ আইনজীবী সহায়তা গ্রহণ করতে পারেন।

লিগ্যাল নোটিশ পাওয়ার পরেও যদি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপনার সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধ করতে না পারে তাহলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপনাকে কোর্টে মামলা করতে হবে।

কিছু সাধারণ প্রশ্ন যা মানুষজন সচারাচর জিজ্ঞেস করে থাকেন

ব্যাংক চেক লেখার ক্ষেত্রে মিশ্র ভাষা গ্রহণযোগ্য কি?

সাধারণত ব্যাংক চেকে মিশ্র ভাষা ব্যবহার করা হয় না।তবে যদি ভুলবশত আপনি মিশ্র ভাষার প্রয়োগ করে ফেলেন তাহলে সে ক্ষেত্রে অসুবিধের কিছু নেই ।তবে যতটা সম্ভব মিশ্র ভাষার প্রয়োগ এড়িয়ে চলুন।

অনেক সময় মিশ্র ভাষায় প্রয়োগের জন্য, বিভিন্ন দ্বিধা দন্ডের মুখে পড়তে হয়।

চেক নাম্বার বলতে কি বোঝায়?

চেক নাম্বার মূলত ছয় থেকে বারো ডিজিটের একটি ইউনিক নাম্বার,যা প্রতিটা চেকের সাথে দেওয়া থাকে। এটি আপনার চেকের সিরিয়াল মেন্টেন করে এবং ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের আপনার আর্থিক লেনদেন ট্র্যাক করতে সুবিধা হয়।

আরো পড়ুনঃ

চেকে কাটাকাটি হলে করণীয়?

যদি থেকে বেশি পরিমাণে ঘষামাজা অথবা কাটাকাটি করে থাকেন তাহলে সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অথবা ব্যাংক ম্যানেজারের স্বাক্ষর গ্রহণ করতে হবে। 

তবে অনেক ব্যাংক শাখার নিয়ম অনুযায়ী, এখানে ব্যাংক মালিকেরও সিগনেচারের প্রয়োজন পড়ে। যেন কোন ধরনের পার্শিয়ালিটি না হয়।

শেষকথা,

বর্তমানে ব্যাংক চেকের স্থান দখল করে নিয়েছে ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সিস্টেম। সে কারণে ধীরে ধীরে মানুষ ব্যাংক চেক ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে আনছে এবং ডিজিটালাইজড ব্যাংক সিস্টেমের দিকে ঝুঁকছে । 

যদিও ডিজিটাল ব্যাংক সিস্টেমকে শতভাগ নিরাপদ বলা চলে না।

কেননা সম্প্রতি সময়ে বেশ কয়েকটি ব্যাংক হ্যাকিং কেলেঙ্কারের পর থেকে মানুষ ধীরে ধীরে মান্ধাত্বর আমলের ব্যাংক চেকের দিকে ফিরে যাচ্ছে।

সর্বপরি  যেকোন ব্যাংকে আর্থিক লেনদেন করার ক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে।ব্যাংক চেকটি অবশ্যই   সযত্ন সংরক্ষণ করতে হবে।

ব্যাংক চেক লেখার ক্ষেত্রে অবশ্যই মনোযোগ সহকারে প্রতিটি তথ্য সরবরাহ করতে হবে।  যাতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অথবা আপনার নিজেরই হেনস্থা না হতে হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *