মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ

সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধ

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধঃ

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালী নাগরিক জীবনে এক অনন্য গৌরব গাঁথা।ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অর্জন বললেও ভুল আখ্যা দেওয়া হবে না।রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা অর্জন করেছি বাংলার চিরায়িত মানচিত্র এবং লাল সবুজের পতাকা।

শুধুই আপামর জনতার রক্ত ও সশস্ত্র সংগ্রাম ই নয়, এ দেশের কন্যা, জায়া, জননীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই সাধের স্বাধীনতা। মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ছিলো এই গৌরবের সড়কে প্রথম পদক্ষেপ।

তবে স্বাধীনতার বয়স ৭ দশক পেরোতেই যেন এই গৌরব বিলীন না হয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম যেন এই সাহসিকতার কথা ও দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা বাঙালী হৃদয়ে জাগ্রত থাকে তার জন্য  প্রয়োজন সঠিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সম্পর্কে জানা এবং তা চর্চা করা।

তাই আজ আলোচনার বিষয় মুক্তিযুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ সম্পর্কে। আশা করি, সঠিক ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে পাঠকগণ দেশের প্রতি তাদের মমতার বহিঃপ্রকাশে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

প্রথম প্রতিরোধ সংগঠনের ইতিহাস

তারিখটি ছিলো ১৯ মার্চ, ১৯৭১। উত্তাল একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চের ১৯ তম দিন। ওইদিন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধযুদ্ধ হয় জয়দেবপুরে (গাজীপুর)। সেখানে ৫০ জন শহিদ এবং দুই শতাধিক আহত হন।

সশস্ত্র প্রতিরোধের ঘটনাপ্রবাহ

১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বর্তমান গাজীপুর বা তৎকালীন জয়দেবপুরের বীর জনতা গর্জে উঠেছিল এবং সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। মনে পড়ে, পহেলা মার্চ দুপুরে হঠাৎ এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দেন।

এ কথা শোনামাত্র সারাদেশের মানুষ স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে প্রতিবাদমুখর হয়ে এ ঘোষণার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসে।

দেশের সর্বত্র স্লোগান ওঠে- ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশ স্বাধীন করো’; ‘পিন্ডি না ঢাকা/ ঢাকা-ঢাকা’; ‘পাঞ্জাব না বাংলা/ বাংলা-বাংলা’; ‘তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা-মেঘনা- যমুনা’; ‘তুমি কে আমি কে/ বাঙালি-বাঙালি’।

বঙ্গবন্ধু ঢাকায় পূর্বাণী হোটেলে এক সভায় ইয়াহিয়ার ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকায় ২ মার্চ ও সারাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করেন এবং ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা আহ্বান করেন।

ঢাকায় যখন পরিস্থিতি পাল্টাচ্ছে দ্রুত, ঠিক তখন ঢাকার ঠিক পাশে জয়দেবপুর মহকুমায় (বর্তমানের গাজীপুর) সংগ্রামী জনতা ও নেতৃবৃন্দ সংগঠিত হচ্ছিলেন। মার্চের ২ তারিখে মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিব উল্লাহ’র ডাকে এক সভায় গাজীপুর মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আ ক ম মোজাম্মেল হককে (বর্তমান মুক্তিযোদ্ধামন্ত্রী) আহ্বায়ক ও মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির শ্রমিকনেতা নজরুল ইসলাম খানকে কোষাধ্যক্ষ করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট এক সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। আমাদের এই ইতিহাসে এই সংগ্রাম পরিষদ খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মাত্র ক’দিনের মধ্যেই এই ১১ জনের নেতৃত্বে জয়দেবপুরের বীর বাঙালি ঘটাবে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস।

পরিষদ মার্চের ৩ তারিখে গাজীপুর স্টেডিয়ামের পশ্চিম পাশের বটতলায় এক বিশাল সমাবেশে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে লাল সবুজ পতাকা উত্তোলন করে। পতাকা ধরেছিলেন হারুন ভূঁইয়া এবং অগ্নিসংযোগ করেছিলেন শহীদউল্ল্যাহ বাচ্চু। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে হাজার হাজার মানুষ জয়দেবপুর থেকে ট্রেনে করে এবং শতাধিক ট্রাক ও বাসে করে মাথায় লাল ফিতা বেঁধে ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান) বঙ্গবন্ধুর ডাকা জনসভায় যোগ দিতে যায়। সে এক অভাবিত দৃশ্য। ৭ মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ জনতা ১১ মার্চ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানায় বিক্ষোভ ও পাকিস্তানি দখলমুক্ত করার চেষ্টা চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের সশস্ত্র বাঁধার মুখে ফ্যাক্টরির গেইটের সামনেই বিক্ষোভ সমাবেশে ছাত্রলীগ নেতা আ ক ম মোজাম্মেল হক হাজারো জনতার সামনে এক অসাধারণ বক্তব্য রাখেন। ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি পাকিস্তানি সেনাদের উদ্দেশ্যে সরাসরি বলেন, ‘I do hereby dismiss Brigadier Karimullah from the directorship of Pakistan Ordnance Factory and do hereby appoint Administrative officer Mr. Abdul Qader (বাঙালি) as the director of the ordnance Factory’.

তার এই ঘোষণা এবং সংগ্রামী জনতার বিক্ষুব্ধ আন্দোলনে জাদুমন্ত্রের মতো কাজ হয়। পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার করিমউল্লাহ এতোটাই ভয় পেয়েছিল যে, সে সমরাস্ত্র কারখানার পেছনের গেট দিয়ে সালনা হয়ে পালিয়ে ঢাকায় চলে আসে। এবং তার ভয় এতোটাই গভীর ছিল যে ১৫ এপ্রিলের আগ পর্যন্ত সে আর গাজীপুরে যাওয়ার সাহস পায়নি। সমরাস্ত্র কারখানা ২৭ মার্চ পর্যন্ত সংগ্রাম পরিষদ ও জনগণের দখলেই ছিল। এরপর মার্চের ১৩ তারিখে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি সাহেবজাদা জেনারেল ইয়াকুব আলী জয়দেবপুর রাজবাড়ি মাঠে হেলিকপ্টারে অবতরণ করতে চেষ্টা করলে হঠাৎ শত শত বিক্ষুব্ধ জনতা হেলিকপ্টারের প্রতি ইটপাটকেল ও জুতা ছুঁড়তে শুরু করে। বাধ্য হয়ে হেলিকপ্টার না নামিয়ে ইয়াকুব ফিরে যায়।কিন্তু ক’দিনের মধ্যেই মোজাম্মেল হকসহ নেতারা খবর পান কুর্মিটোলা (ঢাকা) ক্যান্টনমেন্টে অস্ত্রের মজুদ কমে গেছে এই অজুহাতে জয়দেবপুরে সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে রক্ষিত অস্ত্র নিয়ে যাবে পাকিস্তানিরা। অর্থাৎ সহজ করে বলতে গেলে জয়দেবপুরের বাঙালিদের ভরসার জায়গা সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করা হবে—যেন পাকিস্তানিদের কোনো ধরনের আক্রমণে তারা আত্মরক্ষা বা সাধারণ জনগণকে রক্ষা করতে না পারে। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ এই খবরটি বঙ্গবন্ধুকে জানালে তিনি যে কোনো মূল্যে বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্র করা ঠেকানোর নির্দেশ দেন। অর্থাৎ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে থামাতে হবে, তারা যেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করতে না পারে।

১৯ মার্চ, রোজ শুক্রবার   হুট করে বার্তা এলো ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহান  জেবের  নেতৃত্বে একটি পাকিস্তানি   রেজিমেন্ট জয়দেবপুরের দিকে   এগিয়ে আসছে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট কে নিরস্ত্র করতে ।একজন জেসিও (নায়েব সুবেদার) জয়দেবপুর হাইস্কুলের মুসলিম হোস্টেলের পুকুরে (জকি স্মৃতি প্রাইমারি স্কুলের সামনে) গোসল করার সময় জানতে পারেন যে ঢাকা থেকে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব চলে এসেছে। এই খবর পাওয়া মাত্রই   মোজাম্মেল হক দ্রুত তাদের আবাসন মুসলিম হোস্টেলে ফিরে গিয়ে দুই নেতা  হাবিবুল্লা ও শহীদুল্লাহ বাচ্চুকে এ খবরটি দেন ।শহীদউল্লাহ বাচ্চু তখনই রিকশায় চড়ে শিমুলতলীতে, মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, ডিজেল প্ল্যান্ট ও সমরাস্ত্র কারখানায় শ্রমিকদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে জয়দেবপুরে চলে আসার খবর দেন। 

বঙ্গবন্ধুর ৭ ই মার্চের সুবর্ণ উচ্চারন এদেশের সাধারণ জনগণ,শ্রমিক,ছাত্র, সকল শ্রেনীর মানুষকে এতোই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো যে শহীদুল্লাহ বাচ্চুর নির্দেশে এক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ চারদিক থেকে লাঠিসোঁটা, দা, কাতরা, ছেন, দোনলা বন্দুকসহ জয়দেবপুরে উপস্থিত হয়। সে এক বর্ননাতিত দৃশ্য! সেদিন জয়দেবপুর হাঁটের দিন ছিল। জয়দেবপুর রেলগেটে মালগাড়ির বগি, রেলের অকেজো রেললাইন, স্লিপারসহ বড় বড় গাছের গুঁড়ি, কাঠ, বাঁশ, ইট ইত্যাদি যে যেভাবে পারলো সংগ্রহ করে তা দিয়ে এক বিশাল ব্যারিকেড দেওয়া হলো। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত আরও পাঁচটি ব্যারিকেড দেওয়া হয়, যাতে পাকিস্তানি বাহিনী ইস্টবেঙ্গলের কাছ থেকে অস্ত্র লুট করলেও তা নিয়ে ফেরত যেতে না পারে।দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ । তার উপর অর্ডার এসেছিল সাধারণ জনগণের উপর গুলি ছুঁড়ার। কিন্তু শফিউল্লাহ সেদিন কৌশলে রক্ষা করেছিলেন অসংখ্য মানুষের জীবন। রেলগেইট এলাকায় ব্যারিকেড সরানোর জন্য এবং উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেব সরাসরি গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেয় দ্বিতীয় ইস্টবেঙ্গলের রেজিমেন্টকে । কৌশল হিসেবে বাঙালি সৈন্যদের সামনে দিয়ে পেছনে পাঞ্জাবি সৈন্যদের অবস্থান নিয়ে মেজর শফিউল্লাহকে জনগণের ওপর গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়। কিন্তু শফিউল্লাহর নির্দেশে কৌশলে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা জনতার উপর গুলি না ছুঁড়ে আকাশের দিকে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিরা যখন বুঝতে পারল যে বেঙ্গল রেজিমেন্ট তাদের স্বজাতির উপর গুলি চালাবে না, তখন তারা সামনে এগিয়ে নিজেরাই সরাসরি গুলিবর্ষণ শুরু করল।

 গোলাগুলি প্রতিত্তরে তখন  মোজাম্মেল হক হাবিবুল্লা শহিদ উল্লাহ মনু খলিফা সহ অন্যান্য নেতাকর্মী গন পাল্টা গুলি বর্ষণ করেন পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর উপর। এ সময় তারা অবস্থান নিয়েছিলেন গাজীপুর জামে মসজিদের ওপর।অপরদিকে পিছিয়ে ছিল না এ বাংলার আপামর জনগণ। তারাও যার হাতে যে অস্ত্র ই ছিলো তা দিয়েই আঘাত হেনেছিলো শত্রু বাহিনীর উপর।তবে,শক্তিমত্তার এদিক থেকে এগিয়ে থাকা সুসজ্জিত পাকিস্তান বাহিনীর সাথে বেশীক্ষণ টিকে থাকতে পারেনি লড়াকু এলাকাবাসী। ড. ইউসুফ সহ আহত হন শত শত মানুষ। শহীদ হন নেয়ামত ও মনু সহ অর্ধশতাধিক মানুষ। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানি সেনারা কারফিউ জারি করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ শুরু করলে ছাত্র-শ্রমিক-জনতার প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। জনতা পিছু হটলে দীর্ঘ সময় চেষ্টা করে ব্যারিকেড পরিষ্কার করে অবশেষে ব্রিগেডিয়ার জাহান জেবের নেতৃত্বে চান্দনা চৌরাস্তায় এসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আবারও প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়। নামকরা ফুটবল খেলোয়াড় হুরমত এক পাঞ্জাবি সৈন্যকে পেছন দিয়ে আক্রমণ করেন। তার রাইফেল কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু পেছন থেকে আরেক পাঞ্জাবি সৈন্য হুরমতের মাথায় গুলি করলে হুরমত সেখানেই শহিদ হন।

স্বাধীনতা সম্পর্কে আরো জানতে পড়তে পারেন ;- স্বাধীনতা শব্দটি কিভাবে আমাদের হলো 

উপসংহারঃ

বর্তমানে হুরমতের শহিদ হওয়ার সেই স্মৃতিবিজড়িত স্থানে চৌরাস্তার মোড়ে ‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’ নামে ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে।

১৯ মার্চ গাজীপুর বাসী লড়াকু জনসাধারণ ই সর্বপ্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলো।অসম এই যুদ্ধে বাঙালীদের পরাজয় হলেও এই লড়াই বাঙালীর দেশপ্রেম ও সাহসের বাহক।

আরো পড়ুন;- কাগজ দিয়ে বানানো সবচেয়ে দামি জিনিস কি?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top